রেকর্ডবুকে সাধারণত জায়ান্ট টিম এবং প্লেয়ারদের আনাগোনাই থাকে বেশি। কিন্তু জানলে অবাক হবে বাংলাদেশেরও রয়েছে বেশ কিছু রেকর্ড যা অন্যদের পক্ষে ভাঙ্গা রীতিমত অসম্ভবের পর্যায়ে আছে। সেগুলো হলো, একই ম্যাচে সাকিবের একই টেস্ট ম্যাচে সেঞ্চুরি এবং ১০ উইকেট নেওয়া, আশরাফুলের টেস্ট ডেব্যুতে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান হওয়া, আবুল হাসানের ১০ নম্বরে নেমে সেঞ্চুরি করা, সোহাগ গাজীর একই ম্যাচে সেঞ্চুরি ও হ্যাটট্রিক করা এবং মুস্তাফিজের ওয়ানডে ও টেস্ট অভিষেকে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হওয়া।
পুরো লেখাটি পড়তে না চাইলে ভিডিওটি দেখুন
বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ টেস্ট ও টি-২০ ফর্ম্যাটে বিশেষ উন্নতি করতে না পারলেও ওডিআই ফর্ম্যাটে ছাপ ফেলেছে। এই শতাব্দীর প্রথম দশকে যেখানে তারা শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটীয় দেশগুলির বিরুদ্ধে একটি ম্যাচ জিতলেই সেটি অঘটন হিসাবে বিবেচিত হত, এখন সেখানে তারা সিরিজ জিতলেও সেটিকে বিস্ময়কর ভাবা হচ্ছে না। বাংলাদেশের এই সাফল্য এসেছে এমন এক ক্রিকেটীয় প্রজন্মের কারণে যাঁরা দলবদ্ধ হয়ে লড়াই করতে জানে।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে হাতেগোণা কিছু ক্রিকেটার এসেছে যাঁরা
একক দক্ষতায় ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ ইমপ্যাক্ট ফেলেছেন। তাঁদের সেই পারফর্ম্যান্স
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রেক্ষিতে এখনও রেকর্ড হিসাবেই আছে। এখানে আলোচনা
করা হল বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের দ্বারা অর্জিত এমন কিছু রেকর্ড সম্পর্কে যা
অদূর ভবিষ্যতে সহজে ভাঙবে বলে মনে হয় না।
এই শতাব্দীতে একই টেস্ট ম্যাচে সেঞ্চুরি এবং ১০ উইকেট নেওয়া একমাত্র ক্রিকেটার
২০১৪ সালের নভেম্বরে, খুলনায়, জিম্বাবুয়ের
বিপক্ষে লাল বলের ম্যাচে সাকিব তাঁর নাম রেকর্ডবুকে তোলেন। প্রথম
ইনিংসে তিনি ১৩৭
রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলার পরে সেই একই ম্যাচে দুই ইনিংস মিলিয়ে ১০ উইকেট
নিতে সক্ষম হন। একুশ শতকে প্রথম এবং একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে এই অনন্য কীর্তি
অর্জন করেছিলেন তিনি।
তাঁর আগে অ্যালান ডেভিডসন, ইয়ান বথাম এবং ইমরান খান যথাক্রমে ১৯৬০,
১৯৮০ এবং ১৯৮৩ সালে একটি টেস্টে ১০০ রান বা তার বেশী রান করা এবং
১০ উইকেট বা তার বেশী উইকেট নেওয়া ক্রিকেটার হয়েছিলেন। বর্তমান সময়ে
এমন কৃতিত্ব অর্জন করা দিন দিন বেশ কঠিনতর হচ্ছে।
টেস্ট অভিষেকে সেঞ্চুরি করা ইয়াংগেস্ট ক্রিকেটার
মোহাম্মদ আশরাফুল ২০০১ সালের এপ্রিলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে
ম্যাচে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রাখেন। সেখানে তিনি মাত্র নয় রান করেছিলেন। তবে সেই বছরের শেষের দিকে, আশরাফুল
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তাঁর প্রথম টেস্টেই ২১২ বলে ১১৪ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলেন।
সেঞ্চুরিটি রেকর্ড বইয়ে জায়গা করে নেয় কারণ টেস্ট অভিষেকে সেঞ্চুরি করা সর্বকনিষ্ঠ
খেলোয়াড় হয়েছিলেন আশরাফুল। তখন তার বয়স ছিল ১৬ বছর এবং ৬১ দিন।
তিনি মুশতাক মোহাম্মদের রেকর্ড ভেঙে দেন, যিনি ১৯৬১ সালে
ভারতের বিপক্ষে ১৭ বছর ৭৮ দিন বয়সে ১০১ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। কিংবদন্তী ভারতীয়
ব্যাটার সচিন টেন্ডুলকার তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছেন। তিনি ১৯৯০ সালের জুনে ১৭
বছর ১০৭ দিন বয়সে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তার প্রথম সেঞ্চুরি করেছিলেন। যদিও এই দুই
ব্যাটার আশরাফুলের মতো অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করেননি।
এই শতাব্দীতে ১০ নম্বরে ব্যাটিং করে অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করা একমাত্র ক্রিকেটার
অভিষেক আন্তর্জাতিক ম্যাচেই আলাদা করে নজর কাড়তে যে কোনো
খেলোয়াড়ই আশা রাখেন। সেই আশা অনুযায়ী খেলতে পারলে তাঁদের কাছে ম্যাচটি বিশেষ হয়ে
ওঠে। তবে বোলার আবুল হাসান এমন একটি রেকর্ড করেছিলেন যা তাঁর মতো টেল-এন্ডারের
জন্য শুধু অভিষেক টেস্টেই নয়, সমগ্র টেস্ট কেরিয়ারেই বিশেষ হয়ে থাকবে।
আবুল হাসান ২০১২-র নভেম্বরে খুলনায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে
স্বপ্নের টেস্ট অভিষেক করেছিলেন। সেই ম্যাচে তিনি দশ নম্বরে ব্যাটিং করতে নেমে ১২৩
বলে ১১৩ রান করেছিলেন ১৩টি চার ও তিনটি ছক্কার সাহায্যে। তাঁর ইনিংস বাংলাদেশকে
স্কোরবোর্ডে ৩৮৭ রান তুলতে সাহায্য করেছিল। আবুলের আগে অভিষেক টেস্টে ১০ নম্বরে
ব্যাটিং করে সেঞ্চুরি করেছিলেন রেজিনাল্ড ডাফ ১৯০২ সালে অস্ট্রেলিয়ার হয়।
পেসার আবুল হাসানের ক্যারিয়ার অবশ্য তিন টেস্টেই শেষ হয়ে যায়।
ব্যাট হাতে সফলতা পেলেও আসল কাজের জায়গা বল হাতে করেছিলেন ডাহা ফেইল। মোটে তিনটে
উইকেট পেয়েছিলেন তিনি তিন ম্যাচে।
একই টেস্টে হ্যাটট্রিক ও সেঞ্চুরি
২০১২ সালের নভেম্বরে সোহাগ গাজী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট
অভিষেক করেন এবং প্রথম ম্যাচেই এক ইনিংসে ৬ উইকেটসহ ৯ উইকেট নিয়ে নজর কাড়েন। তিনি
জিম্বাবুয়ে এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পরবর্তী সিরিজগুলিতেও দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রাখেন।
২০১৩-র অক্টোবরে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে অফ স্পিনার
সোহাগ প্রথম ইনিংসে ৭৯ রান দিয়ে দুই উইকেট পান এবং নিউজিল্যান্ড ৪৬৯ রান করে।
ব্যাটিং-সহায়ক পিচে বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে চাপে পড়লেও মমিনুল হকের ১৮১ এবং সোহাগের
অপরাজিত ১০১ রানের সুবাদে ৫০১ রান তোলে।
দ্বিতীয় ইনিংসে নিউজিল্যান্ড ২৬০ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ইনিংস
নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। তবে ৮৫তম ওভারে এমন কিছু ঘটেছিল যা কিউয়িরা প্রত্যাশা করেনি।
সোহাগ পরপর তিন বলে কোরি অ্যান্ডারসন, ব্র্যাডলি-জন ওয়াটলিং ও ডউগ ব্রেসওয়েলের উইকেট
নিয়ে হ্যাটট্রিক করেন। নিউজিল্যান্ড তারপর আর ইনিংস বেশী দীর্ঘায়িত করেনি। শেষমেশ ম্যাচ ড্র হয়। বাংলাদেশ ম্যাচ
না জিতলেও একই টেস্টে হ্যাটট্রিক ও সেঞ্চুরি করে ইতিহাসে স্থান করে নেন সোহাগ।
টেস্ট এবং ওয়ানডে অভিষেকে প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচ পুরস্কার
মুস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশ দলের সেরা পেস বোলারদের একজন। তাঁর
ধীরগতির ডেলিভারির বৈচিত্র্য, অফ-কাটার এবং ইয়র্কার ব্যাটারদের আগ্রাসী হওয়া
প্রতিরোধ করতে এবং নাস্তানাবুদ করে আউট করতে সক্ষম হয়েছে। কেরিয়ারের শুরু থেকেই
তাঁর মুনশিয়ানার কারণে নজরে কেড়েছিলেন মুস্তাফিজুর।
২০১৫-র জুনে মুস্তাফিজুর ভারতের বিপক্ষে তাঁর ওডিআই অভিষেক
করেছিলেন। বাঁ-হাতি পেসার সেই ম্যাচে ৫০ রান দিয়ে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন। তাঁর শিকারের
তালিকার উল্লেখযোগ্য নাম রোহিত শর্মা, সুরেশ রায়না। উত্তেজনাপূর্ণ স্পেলটি
বাংলাদেশকে ৭৯ রানের ব্যবধানে ম্যাচ জিততে সাহায্য করেছিল এবং মুস্তাফিজুর তাঁর
পারফর্ম্যান্সের জন্য প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচের পুরস্কার পান।
পরের মাসে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তাঁর অভিষেক টেস্ট ম্যাচ
খেলেন এবং প্রথম ইনিংসে ৩৭ রান দিয়ে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন। তাঁর চার উইকেটের মধ্যে
হাশিম আমলা ও কুইন্টন ডি ককের মতো তারকা ব্যাটাররা ছিলেন। ম্যাচটি ড্র হিসেবে শেষ
হয় এবং মুস্তাফিজুর প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচের পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। টেস্ট ও
ওডিআই – এই দুই ফর্ম্যাটের অভিষেক ম্যাচেই প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচের পুরস্কার পাওয়ার
কৃতিত্ব এখন অব্দি অন্য কোন খেলোয়াড় অর্জন করতে পারেননি।