পড়ন্ত বিকেল। এই সময়টা এলাকার মাঠে সব বন্ধুরা একসাথে আড্ডা দিয়ে কাঁটায়।
কিন্তু আজ সময়মতো সবাই এসে দেখলো সেখানে অলরেডি মুহিব ও ইমন উপস্থিত। তারা রীতিমত একজন
আরেকজনের সাথে তর্ক করছে। ইমন মুহিবকে বললো সৃষ্টিকর্তা নেই। মুহিব বললো সৃষ্টিকর্তা
যে নেই, এর পক্ষে যুক্তি কি? তখন ইমন উলটো তাকে বললো সৃষ্টিকর্তা যে আছে তার পক্ষে
যুক্তি কি?
এখানে আসলে ভুল কে? লজিকালি চিন্তা করলে কেউই ভুল না। তবে যে কোনো বিতর্কে
যে আগে স্টেটমেন্ট দেয়, সেই স্টেটমেন্ট তাকেই লজিকালি ডিফেন্ড করতে হয়। অপরপক্ষকে লজিকের
ফাঁদে ফেলে পালটা প্রশ্ন করাটা ভুল।
আমির খানের থ্রি ইডিয়টসের সেই সিনটার কথা মনে আছে? মেকানিকাল ল্যাবে টিচার
জিজ্ঞেস করে, হোয়াট ইজ মেশিন? তখন র্যাঞ্চো বইয়ের সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে সহজ ভাষায় উত্তর
দেয়। মানুষের জীবনকে যা সহজ করে তোলে তাই মেশিন। উদাহরণ হিসেবে সে প্যান্টের চেইনের
কথা বলে। সেই স্যার তখন রেগে যায়। তখন র্যাঞ্চো বলে স্যার, অর্থ বুঝে পড়াটাই তো আসল,
বই মুখস্ত করে কি লাভ? তখন স্যার পালটা জবাব দেন, তুমি বইয়ের থেকে বেশি বোঝো?
প্রথম ঘটনার ইমন এবং পরের ঘটনার মেকানিকাল স্যার, দুজনের কথাবার্তাই লজিক্যাল
ফ্যালাসির আওতায় পড়ে। অর্থাৎ যুক্তিবিদ্যায় প্রচলিত কিছু কুযুক্তির মাধ্যমে অপরপক্ষকে
ঝামেলায় ফেলে দেওয়া। যুক্তির ভান করে মিথ্যা বা অযৌক্তিক কিছু বোঝানোর কৌশল।
আরো একটি প্রচলিত উদাহরণ নিয়ে কথা বলা যাক। ধরুন একজন আপনাকে জিজ্ঞেস করলো,
আপনি আগে যেমন চুরি করতেন এখনো কী করেন? এখানে যিনি প্রশ্ন করেছেন, তিনি শুরুতেই ধরে
নিয়েছেন যে আপনি চোর। অর্থাৎ এখানে প্রশ্নটিই ভুল। যদি আগে থেকেই আপনি চোর প্রমাণিত
না হয়ে থাকেন, তাহলে এই ধরণের যুক্তিকে কুযুক্তি হিসেবেই ধরা হয়।
মোট কথা, লজিকাল ফ্যালাসি হচ্ছে সেই ধরণের আর্গুমেন্ট যা শুনলে প্রাইমারিলি
মনে হবে ঠিক, কিন্তু আসলে যুক্তির ভেতরে আছে বিস্তর গণ্ডগোল।
সবথেকে কমন লজিকাল ফ্যালাসি তিনটি। রেড হেরিং ফ্যালাসি, স্ট্র ম্যান ফ্যালাসি
ও ব্যান্ডওয়াগন ফ্যালাসি। লজিকাল ফ্যালাসির শুরুটা গ্রিক ফিলোসফি থেকে। বিখ্যাত দার্শনিক
অ্যারিস্টটলের ‘অর্গানন’ বই থেকে প্রথম এর ধারণা পাওয়া যায়। সেভেন্টিন্থ সেঞ্চুরির
দিকে জন লক সহ আরো কয়েকজন দার্শনিক এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গবেষণা করেন। তবে ফ্যালাসি
টার্মটি ছড়িয়ে পড়তে থাকে নাইন্টিন্থ সেঞ্চুরির দিকে। সেই সময়ে জন স্টুয়ার্ট মিল ও চার্লস
স্যান্ডার্স পিয়ার্সের মতো দার্শনিকরা এই ব্যাপারে প্রচুর কাজ করেন। লজিকাল ফ্যালাসির
জগতে সর্বশেষ সংযোজন দার্শনিক আর্ভিং কপির ‘ইন্ট্রোডাকশন টু লজিক’। যাতে বিভিন্ন ধরণের
ফ্যালাসি নিয়ে প্রথমবারের মতো বিস্তারিত আলাপ করা হয়েছিল। বর্তমান দুনিয়ায় লজিক ও ক্রিটিকাল
থিংকিং রিলেটেড সাবজেক্টগুলোতে লজিকাল ফ্যালাসি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি টপিক।