ইয়েল ইউনিভার্সিটির বেনেকি রেয়ার বুক এন্ড ম্যানুস্ক্রিপ্ট লাইব্রেরির গভীরে ২৪০ পাতার একটি বইয়ের একটি কপি পড়ে আছে। কার্বণ পরীক্ষা করে জানা গেছে, বইটি আনুমানিক ১৪২০ খ্রীষ্টাব্দের দিকে লেখা হয়েছিলো। প্যাচানো হাতে লেখা এবং উদ্ভট কিছু হাতে আঁকা ছবি ছিলো বইটিতে। ২৪×১৬ সেঃ এই বইটিকে বলা হয়, “ভয়েনিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট”। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে রহস্যময় বইয়ের মধ্যে এটি অন্যতম। আজ পর্যন্ত কেউই এই বইটিকে ব্যাখ্যা করতে পারেনি। ঠিক এই কারণেই বইটি আজও একটি রহস্য হয়েই আছে সবার কাছে।
১৯১২ সালের দিকে নিউ ইয়র্ক থেকে রোমের ভিলা মন্দ্রাগনির কাছে এসে থামলেন এক পোলিশ এন্টিক সামগ্রীর ডিলার। নাম তার, ‘উইলফ্রিড ভয়েনিচ’। তিনি কিছু প্রাচীণ মূল্যবান বই খুজছিলেন। ইতালির জেসুইট কলেজ থেকে তিনি একটি বই খুঁজে পান। বইটি হাতে নিয়েই ভয়েনিচ একদম তাজ্জব বনে গিয়েছিলেন, কারন বইটি যে ভাষায় লেখা তার কিছুই তিনি বুঝতে পারছিলেন না। কে এই বইয়ের লেখক? কোন ভাষাতেইবা লেখা এই বইটি? কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলোনা ভয়েনিচ। কৌতুহলবসত তিনি তখন বইটি কিনে আমেরিকায় চলে আসেন। পরবর্তীতে ভয়েনিচ এই বইটির পাঠ্যোদ্ধারে লেগে পড়েন। যদিও শেষ পর্যন্ত তিনি তাতে সফল হননি। তার মৃত্যুর পরে ১৯৬৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির বেনেকি রেয়ার বুক এন্ড ম্যানুস্ক্রিপ্ট লাইব্রেরিতে বইটি সংরক্ষিত করা হয়। মূলত উইলফ্রিড ভয়েনিচ এর নামানুসারেই বইটির নামকরণ করা হয়।
পুরো লেখাটি পড়তে না চাইলে ভিডিওটি দেখুন
১০০ শতাব্দির বেশি সময় পার হয়ে গেলেও বইটির রহস্য
কেউই বের করতে পারেনি। ক্রিপ্টোলোজিস্টদের মতে, বইটিতে কোনো সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার
করা হয়নি। সাধারণ ভাষাতে বইটি লেখা হলেও বর্তমানে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। ভয়েনিচ ম্যানুস্ক্রিপ্টে
ধারাবাহিক ফ্রিকুয়েন্সির একাধিক অক্ষরের উপস্থিতি
রয়েছে৷ কিন্তু অক্ষরের আকৃতি এত উদ্ভট যে ইতিহাসের অন্যান্য অক্ষরাকৃতির সাথে
এর কোনরকম মিলই লক্ষ্য করা যায় না ৷ পুরো পান্ডুলিপিতে কিছু গোছানো চিত্রাংণ দেখা যায়।
ধারণা করা হয়, একজন পান্ডুলিপিটি লিখেছেন এবং আরেকজন এই চিত্রকর্মের কাজগুলো করেছেন।
২৫০ পৃষ্ঠার এই পান্ডুলিপিতে কি এমন রহস্য লুকিয়ে
আছে যা খুঁজে বের করতে বড় বড় সব পন্ডিতদের কালঘাম ছুটে যাচ্ছে?
এটা কি কোনো প্রেমের পত্রাবলীর পান্ডুলিপি? নাকি কোনো
গুপ্ত যোগাযোগের উপায়? নাকি কোনো গোপন জ্ঞানের খনি?
কয়েকশ’ বছর ধরে এমন সব প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিল সবার
মনে।
প্রথম দর্শনে পান্ডুলিপিটিকে তেমন বিশেষ কিছু বলে
মনে হবে না। পুরোনো এই বইটির ওপরের কভারের বাদামী রঙ মলিন হয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
কিন্তু
এর বাহ্যিক জীর্ণ চেহারার পরও পান্ডুলিপিটি এখনো অভিনব। এর ভেতরে পৃষ্ঠার পর
পৃষ্ঠা জুড়ে কোনো এক অজানা ভাষায় নিখুঁতভাবে লেখা রয়েছে
প্রায় ১,৭০,০০০
অক্ষর।
আঁকা রয়েছে এমন অনেক অদ্ভুত ছবি, যা দেখে ঠিক বোঝা যায় না এগুলো
কিসের ছবি। ছবিগুলো আঁকা হয়েছে লাল, সবুজ, নীল এবং হলুদ রঙে। রয়েছে নাম না জানা
উদ্ভিদ আর ফুলের ছবিও। অদ্ভুত দর্শন কিছু নগ্ন গর্ভবতী মহিলার ছোট ছোট জলাধারে
স্নান করার দৃশ্য রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে টিউবের মতো, আবার কোথাও কোথাও স্লাইডের মতো
কিছু জুড়ে দেয়া। বইটিতে ফুল, উদ্ভিদ, আর উদ্ভিদের মূলের কিছু আঁকা ছবে দেখে কোনো
কোনো গবেষক মনে করেন, এটা কোনো উদ্ভিদ বিজ্ঞানের
এবং বনজ ওষুধবিদ্যার বই। আবার, নক্ষত্রের তালিকা এবং অনুপুঙ্খ ছবি দেখে কেউ কেউ
এটাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই বলেও ধারণা করেন। আবার বইটির কিছু কিছু পৃষ্ঠায় দৃষ্টি
সম্পর্কীয় ঘটনার ছবিও আঁকা রয়েছে। কিন্তু এইসব উদ্ভিদ, জ্যোতিষ্ক, দৃষ্টি
সম্পর্কীয় ছবির সমন্বয়ের মানে কী আদতে? আর ছোট ছোট জলাধারে নগ্ন মহিলাদের স্নানের
দৃশ্য দিয়েই বা আসলে কী বোঝানো হচ্ছে? এটা কি কোনো রোগ প্রতিরোধী ওষুধি স্নানের চিকিৎসাবিদ্যা,
নাকি চির যৌবন প্রাপ্তির কোনো উপায়?
কেনইবা সাংকেতিক
ভাষায় লেখা হলো এমন একটি জ্ঞানমূলক বই? কোনো প্রতিভাবান ডাক্তার কি তাঁর সমসাময়িক
ডাক্তারদের কাছ থেকে তাঁর উদ্ভাবন আর আবিষ্কারকে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন? নাকি এমন
কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর কাছ থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন, যারা জ্ঞানের নানান শাখার
মুলোৎপাটন করতে চেয়েছিল সেই সময়?
এত বছর গবেষণা করে
মূলত তিনটি ত্বত্ত উঠে আসে গবেষকদের কাছে।
১. এটি একটি গোপন
সাংকেতিক ভাষায় লেখা পান্ডুলিপি। যা ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থ গোপন করা হয়েছে।
২. হয়তো এটি
পুরোটাই ভুয়া। শুধুমাত্র মানুষকে বোকা বানানোর জন্য এরকমটা করা হয়েছে।
৩. বইটি কোনো অজানা ভাষাতে লেখা হয়েছে। বর্তমানে যার অস্তিত্ব নেই।
তবে কারো মতবাদই
শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
২০১৯ সালে এসে কয়েক জন এ্যাকাডেমিকস কম্পিউটারাইজড পদ্ধতি ব্যবহার করে এর অর্থ উদ্ধারে সফল হয়েছেন বলে দাবী করেছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন, এর ২০ ভাগ হিব্রু এবং বাকী ৮০ ভাগ বিশ্বের অন্যান্য নানান ভাষায় লেখা। গুগল ট্রান্সলেটর এ্যালগরিদম ব্যবহার করে এর উদ্ভিদ বিজ্ঞান সম্পর্কিত অধ্যায় থেকে ‘light’, ‘air’, ‘fire’, ‘farmer’ এরকম শব্দ পাওয়া গেছে। তবে গুগল ট্রান্সলেটর এ্যালগরিদমের বৈজ্ঞানিক জটিলতার কারণে তাও খুব একটা নিশ্চিত নয়।
আর ভয়েনিচ কম্যুনিটি এসবকিছু যাচাই-বাছাই করে সমস্ত ফলাফলই বাতিল করে দিয়েছে। ফলে, একটি প্রশ্ন শেষমেশ রয়েই গেল, “কী রয়েছে ‘ ভয়েনিচের পান্ডুলিপি ‘র এসব সংকেতের আড়ালে?”