বাংলাদেশের ক্রিকেট টিমের সর্বোচ্চ অর্জন এশিয়া কাপেই। তিনবার ফাইনাল খেলেছে তারা এই ট্যুর্নামেন্টে। কিন্তু যদি বলা হয় এশিয়া কাপ ও বাংলাদেশের সাথে টাইটানিকের সম্পর্ক রয়েছে? এশিয়া কাপ রোজ হলে, বাংলাদেশ তার জ্যাক!
পুরো লেখাটি পড়তে না চাইলে ভিডিওটি দেখুন
১৯৮৪ সালে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট ঘটে পৃথিবীতে। তৎকালীন ইন্ডিয়ান প্রাইম মিনিস্টার ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে মহাকাশে প্রথমবারের মতো দড়ি ছাড়া হেটে বেড়ানো। ক্রিকেটের জন্যও চুড়াশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। সেই বছরই প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপের পর্দা নামে।
তবে এশিয়া কাপে বাংলাদেশের পথচলা শুরু হয় ১৯৮৬ সালে। ৮৪ এর সাউথ-ইস্ট এশিয়া কাপ জিতে মূল এশিয়া কাপে জায়গা করে নেয় তারা। তবে প্রথম ছয় আসরে একটিও জয়ের দেখা পায় নি সুজন-নান্নুরা। সবগুলো ম্যাচ রীতিমত বাজে ভাবে হারে। এই সময়ে শুধুমাত্র আতাহার আলি খান ব্যাট ও বল হাতে উল্লেখ করার মতো পারফর্ম করেছিলেন।
২০০৪ সালের আসরে প্রথমবারের মতো জয়ের দেখা পায় বাংলাদেশ। তাও সেই জয় ছিল একদমই আনকোরা হংকং এর সাথে। এশিয়া কাপে প্রকৃত অর্থেই বাংলাদেশের শুরুটা হয় ২০১২ সালে। দেশের মাটিতে সেবার ইন্ডিয়া ও শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে নিজেদের আগমনের জানান দেয় সাকিব-তামিম-মুশফিকরা। আসরে টানা চারটি ফিফটি করেন তামিম ইকবাল। সাকিবও করেন তিনটি ফিফটি। অলরাউন্ড পারফর্ম্যান্সের জন্য পান সিরিজসেরা উপাধিও।
প্রথমবারের মতো বড় কোন ট্যুর্নামেন্টের ফাইনালে বাংলাদেশ। হোম অফ ক্রিকেট শেরে বাংলা স্টেডিয়াম ফেটে পড়ে ক্রিকেটপ্রেমী জনতার উল্লাসে। ফাইনালে আগে ব্যাট করে ২৩৬ রান করে পাকিস্তান। চেজ করতে নেমে তামিম ও সাকিব ফিফটি করে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন বাংলাদেশকে। মাশরাফিও শেষ দিকে এসে ৯ বলে ১৮ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন। কিন্তু নাজিমুদ্দিন ও নাসিরের স্লথগতির ব্যাটিং এর কারণে মাত্র ২ রানে হারে বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হওয়ার অনুভূতি পায় টাইগাররা। গ্যালারিতে দেখা যায় কান্নাভেজা সব মুখ। সাকিবকে জড়িয়ে ধরে ক্যাপ্টেন মুশফিকের সেই কান্না চোখ ভিজিয়ে দেয় দেশের সকল ক্রিকেটভক্তের।
পরের আসরে আবারও ব্যাক টু দ্য প্যাভিলিয়ন। বিশাল ডাব্বা মারে বাংলাদেশ। এরপর ২০১৬ সালের আসরটি হয় টি-টুয়েন্টি ফর্ম্যাটে। দেশের মাটিতে আবারও চমক জাগানিয়া ক্রিকেট খেলে টাইগাররা। প্রথম ম্যাচে ইন্ডিয়ার সাথে হারলেও, বাকি তিনটি ম্যাচই জিতে নেয় তারা। দ্বিতীয় বারের মতো ফাইনাল খেলার স্বাদ পায় সাকিব-তামিমরা। এবার ফাইনালে মুখোমুখি ইন্ডিয়ার সাথে। ফর্ম্যাটটাও নিজেদের কমফোর্ট জোনের না। সবাই ধরেই নিয়েছিল ধোনিদের সাথে পেরে উঠবে না বাংলাদেশ। হয়েছেও তাই। ফাইনালে সহজেই জিতে যায় ইন্ডিয়া। আবারও তীরে এসে তরি ডোবায় বাংলাদেশ দল। তবে সেই আসরে আলো ছড়িয়েছিলেন সাব্বির রহমান ও আল-আমিন হোসেন।
দুই বছর পরে আবারও ওয়ানডে ফর্ম্যাটে ফেরে এশিয়া কাপ। ওয়ানডেতে ততদিনে ভালো দল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। তবে সেই আসরে টাইগারদের জন্য বিশাল ধাক্কা ছিল ইঞ্জুরির কারণে তামিম ও সাকিবের না থাকা। তবুও মাশরাফির নেতৃত্বে শ্রীলঙ্কাকে বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে ট্যুর্নামেন্টের শুভ সূচনা করে টাইগাররা। মুশফিকুর রহিম ১৪৪ রানের দুর্দান্ত একটি ইনিংস খেলেন। পরের ম্যাচেই ঘটে যায় এক অঘটন। আফগানিস্তানের সাথে বিশাল ব্যবধানে হেরে বসে বাংলাদেশ। তবে সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠে সুপার ফোরে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে হারায় তারা। দুটো ম্যাচেই দারুণ খেলেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মুশফিকুর রহিম ও মুস্তাফিজুর রহমান। তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে বাংলাদেশ। আবারও প্রতিপক্ষ ইন্ডিয়া। ততদিনে দুই দলের ভক্তদের মধ্যে শুরু হয়ে গেছে তুমুল রাইভালরি। সোশ্যাল মিডিয়াতে চলছে ব্যাপক কাদা ছোড়াছুড়ি।
সাকিব-তামিম না থাকায় ব্যাকফুটে ছিল বাংলাদেশই। দুবাইয়ের মাটিতে টস হেরে ব্যাটিং এ নামে বাংলাদেশ। লিটন দাস ১১৭ বলে ১২১ রানের দুর্দান্ত একটি ইনিংস খেলেন। কিন্তু মিরাজ-সৌম্য বাদে কেউই তাকে যথার্থ সঙ্গ দিতে পারেন নি সেদিন। তাই ২২২ রানেই থেমে যায় রানের খাতা। তবে বল হাতে আশা দেখানো শুরু করে বাংলাদেশ। মাশরাফি, রুবেল ও মুস্তাফিজ সেদিন হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য।
৪৮ ওভার শেষে ইন্ডিয়ার স্কোর তখন ৬ উইকেটে ২১৪ রান। ৪৯ ওভারের শুরুতে এসেই মুস্তাফিক তুলে নেন আরো একটি উইকেট। মাত্র ৩ রান দেন তিনি সেই ওভারে। আশা দেখতে শুরু করে কোটি কোটি টাইগারভক্তরা। এবার বুঝি হতে চলেছে অপেক্ষার অবসান। প্রথমবারের মতো হয়তো ট্রফি জিততে চলেছে বাংলাদেশ। শেষ ওভারে দরকার ৬ রান। মাহমুদউল্লাহর হাতে বল তুলে দেন ক্যাপ্টেন। প্রথম পাঁচ বলে দেন পাঁচ রান। শেষ বলে ইন্ডিয়ার জিততে দরকার এক রান। আর বাংলাদেশের দরকার একটি ডট বল। কিন্তু কেদার জাদাভ লেগ বাইয়ে এক রান তুলে নেন। আবারও তীরে এসে তরী ডুবে বাংলাদেশের। ভক্তদের হৃদয়ে আরো একবার হয় রক্তক্ষরণ।
এখানেই শেষ না। সেই বছরই নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে ইন্ডিয়ার সাথেই শেষ বলে অবিশ্বাস্যভাবে হেরে বসে বাংলাদেশ। তাই ফাইনালে হারাটা বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের অভ্যাসই হয়ে গেছে বলা চলে।
টাইটানিক সিনেমাতে আমরা দেখেছি
রোজকে বাঁচিয়ে সমুদ্রের হিমশীতল পানিতে ঠান্ডায় জমে মারা যায় জ্যাক। এশিয়া কাপ ও
বাংলাদেশের সম্পর্কটাও ঠিক সেরকমই। বারবার এশিয়া কাপের ফাইনালকে জমজমাট করে তীরে
এসে তরী ডুবে যায় দলটির। এশিয়া কাপ রোজ হলে যেন বাংলাদেশ জ্যাক!