উন্নত দেশগুলোর তুলনায় উপমহাদেশের লোকজন সোশ্যাল মিডিয়া একটু বেশিই ইউজ করে। ফেসবুক গ্রুপগুলাতে প্রায়ই পক্ষে-বিপক্ষে তর্কাতর্কি লেগে যায়। স্পেশালি খেলা ও সিনেমার গ্রুপগুলাতে। বেশিরভাগ তর্কই হয় বায়াসড এবং হাস্যকর সব যুক্তির উপর ভিত্তি করে। ব্রাজিল নাকি আর্জেন্টিনা, মেসি নাকি রোনালদো, সাকিব নাকি তামিম, শাকিব খান নাকি নিশো, রিয়াল মাদ্রিদ নাকি বার্সেলোনা – এসব টপিকে প্রায় প্রতিদিনই অযৌক্তিক সব তর্ক হতে দেখা যায়। তবে অনেক অপযুক্তি আছে যেগুলো সাধারণভাবে দেখলে মনে হয় খুব ভালো যুক্তি। কিন্তু একটু মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করতে পারলে এগুলোর দুর্বলতা ধরা পড়ে। এ ধরনের কুযুক্তি অথবা অনর্থক কথার মারপ্যাঁচের ব্যবহারকেই বলা হয় ফ্যালাসি।
পুরো লেখাটি পড়তে না চাইলে ভিডিওটি দেখুন
ব্যাপারটাকে একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক। ধরেন একদিন আড্ডায় আপনি ও আপনার বন্ধু সুমনের মধ্যে তর্ক লেগে গেছে। আপনি বললেন ভাইরেভাই নাঈম শেখের ব্যাটিং এত বাজে! তখন সুমন বললো, নাঈম শেখের যে এত সমালোচনা করিস, পারলে ওর লেভেলে ক্রিকেট খেলে দেখা।
অথবা ধরেন, আপনি ও আপনার আরেক বন্ধু সিজানের মধ্যে একদিন তর্কাতর্কি লেগে গেলো। আপনি বললেন ভিকি জাহেদ চাল্লু মাল, সাধারণ মানুষ কম দেখছে এরকম ভালো ভালো কন্টেন্ট থেকে টুকে এনে জোড়াতালি কন্টেন্ট বানায়। তখন সিজান বললো, পারলে তুই একটা ভালো নাটক অথবা সিরিজ বানায় দেখা দেখি।
এ তো গেলো হালকা চালের উদাহরণ। এবারে একটা সিরিয়াস উদাহরণ দেই। দেশের কোনো এক মন্ত্রীর দুর্নীতির খবর ফাঁস হয়েছে। সেদিনই তিনি সংবাদ সম্মেলনে এসে বললেন মিডিয়ার সব কথায় কান দিতে নেই। এখন কথা হচ্ছে মন্ত্রীদের দুর্নীতি যেমন ওপেন সিক্রেট, তেমনি মিডিয়ার বেশিরভাগ নিউজই যে বিশ্বাসযোগ্য না তাও সত্য। তাই এক্ষেত্রে মন্ত্রীর লজিক ঠিক আছে। কিন্তু সিচুয়েশন অনুযায়ী সেটি কিন্তু হয়ে যাচ্ছে একটি ফ্যালাসি।
আধুনিক যুগে ফ্যালাসিকে মেইনলি দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ফরমাল ও ইনফরমাল ফ্যালাসি। ফরমাল ফ্যালাসি হচ্ছে যেসব অপযুক্তি কোন স্ট্রাকচারের মধ্যে পড়ে না। অর্থাৎ যেগুলো এস্ট্যাবলিশড কোন লজিকের আওতায় পড়ে না। অন্যদিকে ইনফরমাল ফ্যালাসিতে স্ট্রাকচারাল লজিক পাওয়া গেলেও তার মধ্যে দুর্বলতা থাকে। এই দুই ধরণের ফ্যালাসির আওতায় আরো অনেক ধরণের ফ্যালাসি রয়েছে। যেমন – স্ট্রম্যান আর্গুমেন্ট, সাংক কস্ট ফ্যালাসি, ফলস কজ ফ্যালাসি, এডি হোমিনেম, বার্ডেন অফ প্রুফ, গ্যাম্বলার্স ফ্যালাসি, আপিল টু অথোরিটি, ব্যান্ডওয়াগন ইত্যাদি।
ফ্যালাসির বাইবেল বলা হয় দুটি বইকে। অ্যারিস্টটলের ‘সফিস্টিকাল রেফিউটেশনস’ এবং জন লকের ‘অ্যান অ্যাসে কনসার্নিং হিউম্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং’। এই দুইটি বই থেকে ১৯৬১ সালে আরভিং কপি তার ‘ইন্ট্রোডাকশন টু লজিক’ বইয়ে মোট আঠারোটি ফ্যালাসি নিয়ে ডিসকাস করেছেন। যেই ফ্যালাসিগুলো আমাদের প্রতিদিনের তর্কবিতর্কে সবথেকে বেশি দেখতে পাওয়া যায়।